• শুক্রবার   ০২ ডিসেম্বর ২০২২ ||

  • অগ্রাহায়ণ ১৭ ১৪২৯

  • || ০৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

Find us in facebook
সর্বশেষ:
গৌরবদীপ্ত বিজয়ের মাস শুরু দেশে করোনার টিকার ৪র্থ ডোজ দেওয়া হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী রংপুর সিটি নির্বাচনে ১০ মেয়র প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ নীলফামারীতে ইয়াবাসহ ১৫ মামলার আসামি গ্রেফতার টিসিবির জন্য ২ কোটি ২০ লাখ লিটার সয়াবিন তেল কিনবে সরকার

সাংবাদিকদের আপা শেখ হাসিনা, জন্মদিনে শুভেচ্ছা

– দৈনিক রংপুর নিউজ ডেস্ক –

প্রকাশিত: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২  

Find us in facebook

Find us in facebook

প্রণব সাহা

টানা তিনবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর কাছে দেশবাসীর প্রত্যাশা অনেক। আবার বেশি দিন ক্ষমতায় থাকায় জনগণের প্রতি তাঁর দায়িত্বও একটু বেশি বলতে হবে। সেই দায়িত্ব নেওয়ার মতো শক্ত কাঁধ তিনি জন্মসূত্রেই পেয়েছেন।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার আজ জন্মদিন। শুভ জন্মদিন শেখ হাসিনা। শুভ জন্মদিন সাংবাদিকদের প্রিয় আপা। ১৯৯৬-২০০১-এই পাঁচ বছর যোগ করলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার অভিজ্ঞতা ১৮ বছরের। তিনি সময়ের আগুনে পোড়া খাঁটি মানুষ। ৭৬-এ পা দিয়েছেন তিনি। বলা যায় হীরক জয়ন্তী। যদিও কখনোই ঘটা করে জন্মদিন পালন করেন না বঙ্গবন্ধুকন্যা। তিনি অতি সাধারণ।  

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যাঁর নামে দেশ স্বাধীন হয়েছিল তাঁকে খুন করতে দ্বিধা করেনি মোশতাক-ফারুক-রশিদ খুনিচক্র। ভাগ্যক্রমে বেঁচেছিলেন বঙ্গবন্ধুর আদরের দুই মেয়ে। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতি হয়ে ফিরেছিলেন রিক্ত হাতে। ২১ বছরের রাজপথের সংগ্রাম আর ১৯৮৬ ও ১৯৯১ সালের নির্বাচনী পরাজয়ের বেদনাকে জয় করে পিতার রক্তাক্ত স্মৃতি বুকে নিয়ে ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েই ঘোষণা দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ শাসক নয় সেবক হবে।  

নির্বাচনের দিন ১২ জুন সন্ধ্যায় সেই ঘোষণার সময় ধানমণ্ডির ৫ নম্বর সড়কের সুধা সদনে ছিলাম ভোরের কাগজের রিপোর্টার হিসেবে। তার আগে প্রায় চার বছর ধরে সারা দেশ চষে বেড়ানো আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে। কখনো ঘটা করে জন্মদিনের কেক কেটেছেন মনে পড়ে না। কিন্তু এবারের হীরক জয়ন্তীতে তিনি দেশে নেই। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে গিয়ে তিনি এখন যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯ বারের মতো জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলায় ভাষণ দেওয়ার কৃতিত্বও শেখ হাসিনারই।

১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর যে কঠিন দায়িত্ব কাঁধে চেপেছিল তা হলো, ’৭৫-পরবর্তী ২১ বছরের মুক্তিযুদ্ধ বিরুদ্ধ রাজনৈতিক আবহকে বদলানো। আর জাতির পিতার খুনের বিচার করা। সাবধানে পা ফেলেছিলেন শেখ হাসিনা। অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের খুনিদের বিচার শুরু করার। তাই প্রথমে বাতিল করেছিলেন মানবতাবিরোধী ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ।  

খুনিদের গ্রেপ্তার করে বিচার শুরুও করেছিলেন, কিন্তু শেষ করতে পারেননি। প্রথমবারের মতো সরকার ও সংসদের মেয়াদ পূরণের কৃতিত্ব থাকলেও ২০০১ সালের ভোটে দেশের মানুষ দ্বিতীয়বার সরকার গঠনের মতো প্রয়োজনীয় আসন দেয়নি জাতীয় সংসদে। বিনিময়ে দেশবাসী দেখেছে বিএনপি-জামায়াত সরকারের হাতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু আর প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর অমানবিক ধর্ষণ-নির্যাতন আর অগ্নিসংযোগ লুটের বিভীষিকা।   

চতুর্থ দফায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা শপথ নিয়েছিলেন ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে। এখন তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের মেয়াদ চার দফায় ১৮ বছর। চতুর্থ মেয়াদের প্রধানমন্ত্রিত্ব শেষ করার পথে তিনি। ফলে সবচেয়ে বেশি সময় প্রধানমন্ত্রী থাকার দৌড়ে খালেদা জিয়াকে অনেক আগেই টপকে গেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।   

শুরুতে যেমন বলেছি, বেশি সময় ধরে রাষ্ট্র পরিচালনায় দায়িত্ব থাকা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার কাছে দেশবাসীর প্রত্যাশা এখন অনেক বেশি। আর তার প্রধান কারণ হচ্ছে, তিনি নিজেই নিজের কাজ দিয়ে এই প্রত্যাশা আকাশ সমান করেছেন।

প্রথমবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে শেখ হাসিনা যখন বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুর উদ্বোধন করেন, তখন সেই অনুষ্ঠানে আমরা শেখ মুজিবের কণ্ঠস্বরও শুনেছিলাম, যেখানে তিনি যমুনার ওপর সেতুর কথা বলেছিলেন। আর শেখ হাসিনা যখন দেশের সবচেয়ে বড় সেতুর উদ্বোধন করেছিলেন তখন তাঁর কাঁধেই দায়িত্ব বর্তেছিল আরো বড় পদ্মা সেতু তৈরির। সেই সেতুর ভিত্তি দিয়েছিলেন মুন্সীগঞ্জে ২০০১ সালে আর উদ্বোধন করেন গত ২৫ জুন।  

তিনটি অনুষ্ঠানেই উপস্থিত ছিলাম। একজন সরকারপ্রধান ২১ বছর আগে পদ্মা সেতুর ভিত্তি দিয়ে, তারপর নির্বাচনে হেরে সাত বছর পর আবার জিতে পদ্মা সেতু করার উদ্যোগ নেন। বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ আর ঋণ প্রত্যাখ্যান করে দেশের সবচেয়ে বড় সেতু বানিয়ে দক্ষিণাঞ্চলকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তার পরও তাঁর সমালোচনার শেষ নেই। ৪০ বছর পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছেন। দেশে বিদ্যুতের মোটামুটি ব্যবস্থা করেছেন। সমালোচনা কিন্তু ছাড়ে না। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, বঙ্গবন্ধু ট্যানেল, মেট্রো রেল কোনো কিছু করা থেকেই পিছপা হননি তিনি।  

দীর্ঘমেয়াদের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শুধু নয়, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বা শুধু একজন রাজনীতিক হিসেবে যে মানবিক গুণাবলি ধারণ করেন শেখ হাসিনা, সে জন্য তাঁর শাসনামলে অপহরণ, গুমের মতো অভিযোগ আমাদের বেশি পোড়ায়।

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে আপার সঙ্গে দেখা হয়েছিল গণভবনে। আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে চারজন সাংবাদিককে চীন সফরের সুযোগ করে দিয়েছিলেন তিনি। যাওয়ার আগে কথা বলার জন্য নিজেই সময় দিয়েছিলেন। একান্ত পরিবেশে তখন কথা বলার সুযোগ পেয়ে বলে ফেলেছিলাম ‘চিন্ডিয়া পলিসি’ নিয়ে। প্রধানমন্ত্রীর ধমক নয়, বড় বোনের মতোই হেসে দিয়ে বলেছিলেন ‘চিন্ডিয়া কী’? বললাম. চীন আর ইন্ডিয়া—চিন্ডিয়া। স্নেহের হাসিই পেলাম।

বাংলাদেশে প্রথম বেসরকারি টেলিভিশন লাইসেন্স যেমন এসেছে শেখ হাসিনার হাত থেকে, তেমনি সবচেয়ে বেশি স্যাটেলাইট চ্যানেলের লাইসেন্স দেওয়ার কৃতিত্বও তাঁর। সেসব টেলিভিশনেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর তাঁর সরকারের সমালোচনা হয় বেশি। আবার তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নেই। আরো বৈপরিত্য আছে! শেখ হাসিনার মতো গণমাধ্যমবান্ধব প্রধানমন্ত্রী থাকতে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এত মামলা হয়!

ডিজিটাল বাংলাদেশের পুরো কৃতিত্ব শেখ হাসিনার। অতিমারিতে তাই টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে অনলাইনে টক শো অব্যাহত থাকল, এখনো আছে। শত শত ইউটিউব চ্যানেলে শেখ হাসিনার সরকারকে তুলাধোনা করা হচ্ছে। বিদেশে বসে স্বয়ং শেখ হাসিনাকেও ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করছে অনেকেই। কোনো ছাড় তিনি পাচ্ছেন না। আমরাও কিন্তু ছাড়ি না সমালোচনা করতে।  

জানি আবার কোনো দিন সামনাসামনি দেখা হলে ‘খোঁচা’ খেতে হবে। তবে বাঁচোয়া, এখন আমাদের সামনে যাওয়ার সুযোগ খুব কম, এমনকি আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনেও। এখন অবশ্য এই সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনাই সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে সব প্রশ্নের জবাব দেন। সুযোগ পেয়েও আমরা অনেকে কেবল প্রশংসায় ভাসাই তাঁকে। তাঁর কাছ থেকে দরকারি তথ্য বের করে আনার প্রশ্ন কমই থাকে।   সরাসরি সম্প্রচারে তা সাধারণের নজরও কাড়ে।  

কিন্তু খুব মনে আছে, গণভবনের সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বিতর্ক করে, সে সম্পর্কে পত্রিকার পাতায় রিপোর্ট লিখেও আর যাই হোক, ডিজিটাল সিকিউরিটি বা মানহানির মামলায় পড়তে হয়নি। আর আগেও লিখেছি, শেখ হাসিনা যখন বিরোধী দলের নেতা তখন অনেক খবরের উত্সও তিনি। এমনকি অন্য সূত্রে পাওয়া তথ্য শেখ হাসিনা শুধু নিশ্চিতই করে দেননি, কার সাক্ষাৎকার নিতে হবে, সে পরামর্শও দিয়েছেন।  

কয়েক দিন আগে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ৮৫ জন নির্বাচনী কর্মকর্তা কাজে যোগ দিতে পারবেন না বলে চূড়ান্ত রায় দিয়েছেন। আজ বলতে হয়, ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আমার তখনকার কর্মস্থল প্রথম আলোতে এই নিয়োগ নিয়ে প্রতিবেদন লেখার তথ্য শুধু নয়, এসংক্রান্ত কিছু প্রমাণপত্র শেখ হাসিনা পাঠিয়েছিলেন। এমন একজন সেই কাগজপত্র কারওয়ান বাজারে নিয়ে এসেছিলেন, যিনি এখন বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। যদিও বিসিএস পরীক্ষায় ভালো ফল করা সত্ত্বেও তাঁর চাকরি দেয়নি বিএনপি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে চাকরি পেয়ে নিজের মেধার পরিচয় দিয়েছেন বলেই আজ তাঁর নামটি লিখলাম না।  

২০০৪ সালের নৌবাহিনীর ১৭ জন কর্মকর্তাকে কোর্ট মার্শাল করার ব্যাপারে একটি প্রতিবেদন করার সময়ও শেখ হাসিনার সহযোগিতা ছিল প্রত্যক্ষ। ২০১৫ সালে দৈনিক ইত্তেফাকের ঈদসংখ্যায় তা বিস্তারিত লিখেছিলাম।

২৮ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনার জন্মদিনে এই লেখা শুধু শুভেচ্ছা জানানোই নয়। আজকের এই নিবেদন একজন রিপোর্টার হিসেবে একজন সংবাদমাধ্যমপ্রিয় রাজনীতিকের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনও বটে। সরকারপ্রধান হিসেবে শেখ হাসিনার সমালোচনা হতেই পারে। কিন্তু একজন মানুষ আর পোড় খাওয়া সফল রাজনীতিক হিসেবে তাঁকে জন্মদিনে শ্রদ্ধা-শুভেচ্ছা না জানানোটাই বরং বেমানান। প্রিয় আপা, আপনি সুস্থ থাকুন। শুভেচ্ছা।

লেখক : সম্পাদক, ডিবিসি নিউজ।

Place your advertisement here
Place your advertisement here