• শুক্রবার   ২৭ মে ২০২২ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ১৩ ১৪২৯

  • || ২৪ শাওয়াল ১৪৪৩

Find us in facebook
সর্বশেষ:
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে অর্থনীতিকে গতিশীল রেখেছে সরকার- প্রধানমন্ত্রী মরণোত্তর দ্যাগ হ্যামারশোল্ড মেডেল পেলেন ২ বাংলাদেশি নীলফামারীতে দুস্থ ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে বাইসাইকেল বিতরণ লিচুকে ঘিরে দিনাজপুরে দৈনিক ১০ কোটি টাকার লেনদেন ‘গুপ্তধন পেতে জিনের বাদশাহকে ৮ লাখ টাকা দিয়েছি’

রংপুরে প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে বড়বিল জামে মসজিদ

– দৈনিক রংপুর নিউজ ডেস্ক –

প্রকাশিত: ১০ এপ্রিল ২০২২  

Find us in facebook

Find us in facebook

ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ রংপুরে প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে কলি ও দলি আমিন বড়বিল পাকা জামে মসজিদ। রংপুর মহানগরী থেকে প্রায় বিশ কিলোমিটার দূরে গঙ্গাচড়া উপজেলার পশ্চিমে বড়বিল মন্হনাহাট পার্শ্ববর্তী মিয়াপাড়া এলাকায় মসজিদটির অবস্থান। দৃষ্টিনন্দন এই মসজিদটি দেখতে প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে অসংখ্য দেশি-বিদেশি পর্যটক আসেন।

পাকা স্থাপনাটি নির্মাণ করা হয়েছিল বাংলা ১২৪৮ সনে (১৮৪১ খ্রিস্টাব্দ)। মাঝে পার হয়ে গেছে দীর্ঘ ১৮‌‌১টি বছর।  মসজিদটির গায়ে আরবি হরফে লেখা ফলক দেখে প্রাচীন নিদর্শনটির বয়স সম্পর্কে এমন তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। প্রাচীন এই মসজিদটি আজও নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। সেখানে এখনো নিয়মিত নামাজ আদায় চলছে।
কথিত আছে, মিয়াপাড়া গ্রামে আজগর মিয়ার বংশধর কলি আমিন ও দলি আমিন নামে সহোদর বাস করতেন। তাদের উদ্যোগেই মসজিদটি নির্মিত হয়। তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটি চুন-সুরকি ও ইট দিয়ে তৈরি। মসজিদের ভেতরে কারুকার্যখচিত অসংখ্য নকশা রয়েছে। বিশেষত্ব হলো- একটি নকশার সঙ্গে আরেকটির মিল নেই।

শুধু তাই নয়, ১৩ জন রাজমিস্ত্রি দীর্ঘদিন কাজ করে মসজিদটি নির্মাণ করেন। যাদের সবাই ছিল অচেনা মানুষ। ১৩ জন রাজমিস্ত্রি কাজ করলেও খাওয়ানোর সময় খুঁজে পাওয়া যেত ১২ জন মিস্ত্রিকে। তারা সবাই লম্বা এবং একই রকম দেখতে হওয়ায় খাওয়ার বাদ পড়া একজনকে খুঁজে বের করা যেত না। লোকজনের ভাষায় তাঁরা বিশ্বকর্মা নামে অভিহিত ছিলেন।
স্থানীয়দের দাবি, তাদের পূর্বপুরুষের কাছে শুনেছেন মসজিদটির নির্মাণকাজে ব্যবহৃত চুন-সুরকি, ইট ও নকশা ঘিরে ভাজা। বিশেষ করে নকশাগুলো তৈরির পর তা বিশাল আকৃতির একটি কড়াইয়ে ঘি ঢেলে তাতে ভেজে নেওয়া হতো। দীর্ঘসময় সেই কড়াই মসজিদ নির্মাতাদের উত্তরসূরিরা সংরক্ষণ করলেও এখন তা মসজিদের অযুখানার পাশে রাখা রয়েছে। ঐতিহাসিক এই মসজিদটিকে কেউ কেউ অলৌকিক মসজিদও মনে করেন। এর দৃষ্টিনন্দন কারুকাজ আজও মানুষকে মোহিত করে।
 
সরেজমিনে দেখা যায়, বড়বিল মন্হনাহাট থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার পশ্চিমে বড়াইবাড়ি পাকা রাস্তার পাশে দৃষ্টি নন্দন এই মসজিদটি অবস্থিত। ৫২ ফিট দৈর্ঘ্য ও ২১ ফিট প্রস্থ বিশিষ্ট এ মসজিদের ছাদে রয়েছে ৩টি গম্বুজ। যার মাথায় রয়েছে ৪ ফিট উঁচু নকশা।  মসজিদের প্রবেশ পথে রয়েছে গাম্ভির্যপূর্ণ তোরণ। মসজিদের দক্ষিণ পাশে রয়েছে সুউচ্চ আজানের মিনার। মসজিদটির ৪ কোণায় ৪টি এবং পূর্ব-পশ্চিমে মাঝখানে ছোট আকারের ৪টি গম্বুজ। ভেতরের গাঁথুনিতে রয়েছে ভিন্ন আঙ্গিকের নকশা। মসজিদটির গঠন শৈলী দেখে মনে হয় এটি মোঘল আমলের স্থাপত্যকলা অনুসরণ করা হয়েছে। বর্তমানে মূল মসজিদ ঠিক রেখে পশ্চিমে নতুন করে মসজিদের সম্প্রসারিত অংশ বাড়ানো হয়েছে।

কলি ও দলি আমিন মসজিদটি নির্মাণের পর ভূমিকম্পে এটি প্রায় কয়েক ফিট দেবে যায়। তাই অনেকের কাছে এটি দাবা মসজিদ হিসেবেও পরিচিত। তবে ভূমিকম্পে মাটিতে দেবে যাওয়ায় মসজিদের জানালাগুলো মাটির সঙ্গে লেগে গেছে। দরজাগুলো খাটো হয়ে যওয়ায় মসজিদে প্রবেশ করতেও কষ্ট হয়। ছাদসহ বিভিন্ন স্থানে ফাটল ধরেছে। বর্তমানে মসজিদটি ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে। যেকোনো সময় ধসে পড়ার শঙ্কাও রয়েছে।

বর্তমানে মসজিদটিতে মুসল্লিদের নামাজের জায়গা সংকুলান না হওয়ায় এর গা ঘেঁষে ৩ তলা ফাউন্ডেশন দিয়ে আয়তন বৃদ্ধি করা হয়েছে। পুরনো মসজিদটি প্রাচীনকীর্তি হিসেবে রেখে এলাকাবাসী মসজিদের সামনে সম্প্রসারণ ভবন নির্মাণকাজ করছেন। তবে অর্থাভাবে এখনো নতুন অংশের পুরোপুরি নির্মাণকাজ শেষ হয়নি।

ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদটির বর্তমান কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম সুমন জানান, মসজিদটি নির্মাণের ইতিহাস তিনি তার পূর্বসূরীদের মুখে শুনেছেন। ওই মসজিদ সম্পর্কে লোকমুখে শোনা বিস্ময়কর তথ্যগুলো যুগের পর যুগ ধরে মুখে মুখে প্রচার হয়ে আসছে। বহু বছর ধরে মসজিদের চুন-সুরকি ও ইট ভাজতে ব্যবহৃত কড়াইটি তাদের কাছে সংরক্ষণে রেখেছিলেন। সবশেষ ২০১৬ সালে কড়াইটি মসজিদ কমিটিকে ওয়াকফ করেছেন।

মসজিদ কমিটির সহসভাপতি নূর আলম বলেন, প্রাচীন এই মসজিদটির নির্মাণ বাংলা ১২৪৮ সন এবং ইংরেজি ১৮৪১। পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শোনা মসজিদ নির্মাণে ‌১৩ জন লোক কাজ করেছে। কিন্তু খাওয়ানোর সময় একজন কম থাকত। এমনকি হাজিরা দেওয়ার সময়ও নাকি ১২ জন ছিল। ঐতিহ্যবাহি এই মসজিদটির গাথুনি ৪৮ ইঞ্চি। নির্মাণে ব্যবহৃত চুন-সুরকি ও ইট ভিয়ে ভাজা ছিল।

স্থানীয় প্রবীণ ও গঙ্গাচড়া মডেল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মজিদ  বলেন, আমরা ছোটবেলায় এখানে মক্তবে আরবি শিক্ষা নিতে এসে মসজিদটি দেখেছি। তখনকার মুরব্বিদের কাছ থেকে মসজিদ নির্মাণের ইতিহাস জেনেছি। ছোটবেলায় মসজিদের নকশা দেখেছি, একটা সারির সাথে আরেকটা কোনো মিল নেই। এমন মসজিদে তিনটি কাতারের বেশি নামাজ আদায়ে জায়গা ছিল না। কিন্তু এখন এটির সংস্কার এবং সম্প্রসারিত হওয়াতে শত শত মানুষ একসাথে নামাজ আদায় করতে পারছেন।

মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক আলাল উদ্দিন সরকার বলেন, এটি নির্মাণের পর ১৯৪৯ সালে ভূমিকম্পে দেবে যায়। পরবর্তীতে গ্রামের লোকজন মিলে মসজিদের সংস্কার করা হয়। বর্তমানে পুরনো মসজিদটি প্রাচীনকীর্তি হিসেবে ঠিক রেখে এর সামনের অংশে তিনতলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণের লক্ষ্যে কাজ করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও অর্থাভাবে কাজ থেকে আছে।

এ বিষয়ে স্থানীয় গবেষক ও লেখক রানা মাসুদ জানান, ঐতিহাসিক এই মসজিদ রংপুর অঞ্চলের ঐতিহ্য। এই মসজিদের যেমন সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, তেমনি রয়েছে অলৌকিক কিছু অজানা তথ্য। এ কারণে এই মসজিদ সাধারণ মানুষকে আকর্ষিত করে। অনেকেই মসজিদটি দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে এখানে বেড়াতে আসে।

#ঢাকা পোস্ট

Place your advertisement here
Place your advertisement here