• বুধবার   ০১ ডিসেম্বর ২০২১ ||

  • অগ্রাহায়ণ ১৬ ১৪২৮

  • || ২৪ রবিউস সানি ১৪৪৩

Find us in facebook
সর্বশেষ:
খালেদাকে বিদেশে যেতে আইনি প্রক্রিয়া মানতে হবে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানে ১৫ কোটি ডলার ঋণ দিচ্ছে এডিবি মূল্যায়ন ও অগ্রগতিতে প্রথম গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট এনবিআর উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে নিরলস কাজ করছে: প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগ করবে তুরস্ক

বন্যাসহিষ্ণু বিনাধান-১১: একই জমিতে বছরে চারবার ফলন 

– দৈনিক রংপুর নিউজ ডেস্ক –

প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর ২০২১  

Find us in facebook

Find us in facebook

দেশে প্রতি বছর বন্যার পানিতে ডুবে বিপুল পরিমাণ ধান নষ্ট হয়। এ ক্ষতির হাত থেকে সাধারণ কৃষককে রক্ষায় এবং চালের উৎপাদন বাড়াতে বিনাধান-১১ উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা)। জলমগ্নসহিষ্ণু উচ্চফলনশীল জাতের বিনাধান-১১ বন্যার পানিতে ডুবে নষ্ট হয় না। পাশাপাশি আগাম জাতের এ ধানের চারা মাটিতে রোপণের পর ৮০ দিনের মধ্যে ফলন ঘরে তোলা যায়। আমন জাতের বিনাধান-১১ চাষে কৃষকের খরচও সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ কম হচ্ছে। এছাড়া বছরে একই জমিতে চার ধরনের আবাদ করা যায়। এতে কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে।

সূত্র জানায়, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে দেশে প্রতি বছর অতি বৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা ও বন্যা দেখা দিচ্ছে। এতে প্রায় ২০ লাখ হেক্টর জমির ধান কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ে আকস্মিক বন্যা, অতি বন্যা, জোয়ারের বন্যা, পাহাড়ি ঢলের বন্যায় আবাদি জমি জলমগ্ন থাকে। ফলে রোপা আমন মৌসুমে আবাদ করা ধানের জাতসমূহ বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আকস্মিক বন্যার মধ্যে আমন ধানের ফলন ধরে রাখতে বিনার বিজ্ঞানীরা জলমগ্নসহিষ্ণু ধানের জাত বিনাধান-১১ উদ্ভাবন করেছেন। নতুন উদ্ভাবিত ধানের এ জাত ২৫ দিন জলমগ্ন অবস্থা সহ্য করতে পারে। বন্যাকবলিত জমিতে হেক্টরপ্রতি ৫ থেকে ৫ দশমিক ৫ টন এবং বন্যামুক্ত জমিতে ৬ থেকে ৬ দশমিক ৫ টন পর্যন্ত ফলন হচ্ছে। আমন মৌসুমে জাতটির জীবনকাল ১১০ দিন। এর মধ্যে বীজতলা থেকে চারা তৈরিতে ৩০ দিন সময় লাগে। আর চারা জমিতে রোপণ করার পর বাকি ৮০ দিনে ধান কৃষকের গোলায় উঠানো যায়। সময় কম লাগায় দুটি ফসলি জমিকে ৩-৪ ফসলি জমিতে রূপান্তর করা সম্ভব হয়েছে।

সূত্র আরও জানায়, শুধু ময়মনসিংহ নয়, উত্তরের জনপদ রংপুরের বিভিন্ন এলাকা, বরেন্দ্রভূমি, গোপালগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েক হাজার হেক্টর জমিতে জলমগ্নসহিষ্ণু ও উচ্চফলনশীল বিনাধান-১১ চাষ হচ্ছে। বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) মহাপরিচালক বিজ্ঞানী ও কৃষিবিদ ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, অন্যসব জাতের ধান কৃষকের গোলায় উঠতে প্রায় ১৫০-১৬০ দিন লাগে। তবে বিনা-১১ জাতের ধান ৮০ দিনের মধ্যে কৃষক গোলায় উঠাতে পারেন। কারণ এটা আগাম জাতের ধান। এছাড়া হেক্টরপ্রতি অন্যসব ধান আবাদের তুলনায় কৃষকের ৫০ শতাংশ কম খরচ হয়। এতে কৃষক লাভবান হয়। পানি কম লাগে। শ্রমিক বা কামলা খরচও কম। সার কম দিতে হয়। এ ধান আগাম চাষের কারণে তিন থেকে চার ধরনের ফসল একই মাঠে উৎপাদন করা যাচ্ছে। এছাড়া বন্যার পানিতে ২৫ দিন বেঁচে থাকে। অবশ্য ২৫ দিনের বেশি পানি থাকলেও কোনো সমস্যা নেই। গাছ পচে গেলেও সেখান থেকে নতুন কুশি বা গাছ জন্মায়। সেই জন্মানো গাছ থেকে নতুন করে ধান হয়। নিজ কার্যালয়ে তিনি আরও জানান, একই জমিতে বিনা-১১ আবাদের পর আউস ধান আবাদ করা যায়। আউস কাটার পর আমনের আবাদ করা যায়। আমন ঘরে উঠলে সেখানে সরিষার আবাদ করা যায়। এক বছরে একই জমিতে মোট চারটি ফলন করা যায়।

সরেজমিন ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা গেছে, বিনার উদ্যোগে কৃষকরা এ জাতের ধান আবাদ করছেন। একই সঙ্গে একই জমিতে স্থানীয় জাতের ধান আবাদ হচ্ছে। একই সময় বিনা-১১ এবং স্থানীয় জাতের ধানের চারা রোপণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে লক্ষ করা যায়, অন্যসব জাতের ধান এখনো সবুজ। কিন্তু বিনা-১১ জাতের ধান সোনালি রং ধারণ করেছে। ধানও পেকেছে। অনেক জায়গায় আবার ধান কেটে মাঠে ফেলে রাখা হয়েছে। যা কৃষকের গোলায় তোলার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। পাশাপাশি যেসব স্থানে বিনা-১১ ধান রোপণ করা হয়েছে, সেখানে ধান তোলার পর অন্যসব সফল রোপণ করার প্রস্তুতি চলছে।

ময়মনসিংহের ৪নং পরানগঞ্জ এলাকার কৃষক আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, বিনাধান-১১ আবাদ করে ফলন অনেক ভালো হয়েছে। যেখানে পাশের জমিতে ধান এখনো সবুজ সেখানে আমার জমিতে ধান পেকেছে। শিগগিরই ধান কাটা শুরু করব। এছাড়া পাশের জমিতে ধান কাটা শেষ। তিনি বলেন, আগে স্থানীয় স্বর্ণা ও বিআর জাতের ধান আবাদ করতাম। সেখানে ধান পাকতে অনেক সময় লাগতো। এ কারণে বছরের একটি সময় জমিতে কোনো আবাদ করতে পারতাম না। খরচ বেশি হতো লাভ কম হতো। এখন বিনা-১১ জাতের ধান আবাদে উৎপাদন খরচ কমেছে। পাশাপাশি তিন থেকে চার ধরনের ফলন করতে পারছি। আয়ও বেশি হচ্ছে। তাই এ জাতের ধান সব সময় আবাদ করব। একই স্থানের বিনাধান-১১ আবাদ করা কৃষক আবু সাঈদ যুগান্তরকে বলেন, এ জাতের ধান আবাদে বিঘাপ্রতি ৪ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। যা আগে অন্য সব ধান আবাদে দ্বিগুণ খরচ হতো। আর অল্পদিনেই ধান ঘরে তুলতে পারছি। পাশাপাশি বন্যায় পানি উঠলেও কোনো ভয় নেই। কারণ ধান নষ্ট হয় না।

ছাতিয়ানতলা গ্রামের কৃষক আব্দুল আজিজ বলেন, এবার দুই বিঘা জমিতে বিনাধান-১১ চাষ করেছি। জমির পাশের অন্যসব ধান এখনো সবুজ। কিন্তু তার খেত সোনালি ধানে ভরে গেছে। গত বছর তিনি বিঘাপ্রতি ১৬ মন ধান ঘরে তুলেছেন। তিনি বলেন, বিনার কর্মকর্তাদের পরামর্শে বিনাধান-১১ চাষ করছি। অন্যরাও আমার দেখাদেখি উৎসাহিত হয়ে এ ধান চাষ করেছে। এ ধান কাটার পর সরিষা চাষ করব। সরিষা তোলার পর আবার বোরো ধান রোপণ করব। তিনি বলেন, বিনা তাকে দুই বছর ধরে ধানের বীজ দিচ্ছে। তবে বিনার প্রশিক্ষণে কৃষকরা নিজেরাই বীজ উৎপাদন করতে শিখেছেন। এ বন্যা সহনশীল ধান চাষ চরাঞ্চলের অন্য কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারলে চরের মানুষের আর অভাব থাকবে না।

বিনার বোর্ড সদস্য অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল বলেন, বিনাধান-১১ আবাদে সফলতার মুখ দেখায় এখন খুশি সবাই। বন্যা সহনশীল এ ধান চাষ চরাঞ্চলের অন্য কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। তাহলে কৃষকরা আরও লাভবান হবেন।

Place your advertisement here
Place your advertisement here