• বৃহস্পতিবার   ০৭ জুলাই ২০২২ ||

  • আষাঢ় ২২ ১৪২৯

  • || ০৬ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৩

Find us in facebook
সর্বশেষ:
বায়তুল মোকাররমে ঈদের প্রথম জামাত ৭টায় হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানি শুরু ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফেরার পথে প্রাণ গেল মা-মেয়ের মানুষের কষ্ট লাঘবে লোডশেডিংয়ের রুটিন করার পরামর্শ প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল ডিভাইস আমরা রপ্তানি করব: প্রধানমন্ত্রী

ছয় দফার পথ ধরে স্বাধীনতা

– দৈনিক রংপুর নিউজ ডেস্ক –

প্রকাশিত: ৭ জুন ২০২২  

Find us in facebook

Find us in facebook

ড. সেলিনা আখতার   

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর হাত থেকে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশ কুিসত শোষণের কালো হাত থেকে মুক্তি পায়নি। পূর্ব পাকিস্তানকে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ২৪ বছর শাসন-শোষণ করে। আর পশ্চিম পাকিস্তানের এই পরিকল্পিত শাসন-শোষণের হিংস্র দাবানল থেকে মুক্তির জন্য শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে নিখিল পাকিস্তান জাতীয় সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দাবিসংবলিত এক কর্মসূচি পেশ করেন, যা ঐতিহাসিক ছয় দফা নামে পরিচিত।

লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলগুলোর সম্মেলনে ছয় দফা কর্মসূচি পেশ করার পর বঙ্গবন্ধু ঢাকায় ফিরে আসেন। ১১ ফেব্রুয়ারিতে তিনি সাংবাদিকদের কাছে ছয় দফার প্রতিটি দফা বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেন। ছয় দফাকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রস্তাব রাখা হয়। তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম দফায় অর্থনৈতিক বিভিন্ন প্রস্তাব বিধৃত হয় এবং ষষ্ঠ দফা ছিল নিরাপত্তাবিষয়ক। অর্থনৈতিক প্রস্তাবগুলোর আওতায় অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় সামগ্রিক ও পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয় অঙ্গরাজ্যগুলোকে অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানের বেলায় পূর্ব পাকিস্তানকে। বিদেশনীতি ও নিরাপত্তা ফেডারেল সরকারের হাতে রাখার প্রস্তাব করা হলেও ষষ্ঠ দফার নিরিখে পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তা বহুলাংশে পূর্ব পাকিস্তানের ওপর বর্তায়। বৈদেশিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক সাহায্য অঙ্গরাজ্যগুলোর দায়িত্বে থাকার প্রস্তাবের দ্বারা বিদেশনীতির ক্ষেত্রেও ফেডারেল সরকারের দায়িত্ব ও ক্ষমতা সীমিত হয়ে আসে। প্রকৃতপক্ষে ছয় দফায় কেন্দ্রে ফেডারেল সরকারের ভূমিকা নির্দেশিত হয়।

এরই মধ্যে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ কর্তৃক ছয় দফা কর্মসূচি যথারীতি গৃহীত হয় এবং ১৯৬৬ সালের ২৩ মার্চ কর্মসূচির বিস্তারিত ব্যাখ্যাসংবলিত একটি পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়। বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তানব্যাপী ঝটিকা সফরের মাধ্যমে জনসভা করতে লাগলেন। ‘আমাদের বাঁচার দাবি ৬ দফা কর্মসূচি’ শিরোনামে একটি প্রচার পুস্তিকা বিতরণ করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা আন্দোলন বাংলার রাজনীতিতে বাঙালিদের মনে জাগিয়ে তোলে পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণ থেকে মুক্তি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। ভাষা আন্দোলনে অভিব্যক্ত বাঙালি জাতীয়তাবাদ পূর্ণতা লাভ করে ছয় দফা আন্দোলনের মাধ্যমে। বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের দাবি বাঁচার দাবি ছয় দফা।

১৯৬৬ সালের এপ্রিলে ঐতিহাসিক ছয় দফার আন্দোলন আকাশছোঁয়া আন্দোলনে রূপ নেয়। বাংলার জনগণ মুক্তির জন্য হয়ে পড়ে পাগলপারা। এই সময়ে বঙ্গবন্ধু মাত্র ৩৫ দিনে ৩২টি জায়গায় জনসভা করেন।

ছয় দফা কর্মসূচি পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পরই আইয়ুব খানের সহযোগীরা বিভিন্ন সংবাদপত্রে ছয় দফা কর্মসূচির বিরূপ সমালোচনা করে বিবৃতি দিতে শুরু করেন। ছয় দফার শর্তগুলো পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর মাথায় বজ্রের মতোই আঘাত হানে। তারা মনে করে, এই ছয় দফা দাবি, এর প্রবক্তা এবং অনুসারীদের কঠোর হস্তে দমন করা না গেলে পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা করা যাবে না। পূর্ব পাকিস্তানের আইন ও পার্লামেন্টারি দপ্তরের মন্ত্রী আব্দুল হাই চৌধুরী ছয় দফাকে ‘দেশদ্রোহিতার নামান্তর’ বলে অভিহিত করেন। প্রাদেশিক কাউন্সিল মুসলিম লীগের জেনারেল সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম ও এম এন এ খাজা খয়েরুদ্দিন এক সংবাদ সম্মেলনে ছয় দফাকে ‘বিপজ্জনক’ বলে বিশেষায়িত করেন। ১০ মার্চ ১৯৬৬ প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান হুমকি দিয়ে বলেন, ‘ছয় দফার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ চাপাচাপি করলে অস্ত্রের ভাষায় জবাব দেওয়া হবে এবং দেশে গৃহযুদ্ধ হয়ে যাবে। ’ ১৬ মার্চ রাজশাহীতে ছয় দফাকে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা প্রস্তাব এবং দেশকে ধ্বংস করার চক্রান্ত হিসেবে চিহ্নিত করে কঠোর ভাষায় তিনি বলেন, ‘ইহা বৃহত্তর বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়নেরই একটি পরিকল্পনা। ’ তিনি এর বিরুদ্ধে সাবধানবাণী উচ্চারণ করে বলেন, “এই ‘জঘন্য স্বপ্ন’ বাস্তবায়িত হলে পূর্ব পাকিস্তানবাসী গোলামে পরিণত হবে, তাই এ কাজ তিনি কখনোই সফল হতে দেবেন না। ”

ছয় দফার বিষয়বস্তু জেনে সামরিক জান্তার প্রতিনিধি পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনেম খাঁ ঘোষণা করেন যে তিনি যত দিন গভর্নর থাকবেন তত দিন শেখ মুজিবকে জেলে পচতে হবে। ছয় দফার স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের জনপ্রিয়তা সম্পর্কিত খবরাখবর প্রকাশ না করার জন্য সংবাদপত্রের ওপরও বিধি-নিষেধ জারি করা হয়। আইয়ুব খান ও তাঁর সহযোগীরা বিভিন্ন সভা-সেমিনারে পূর্ব বাংলার জনগণের কাছে শেখ মুজিব ও তাঁর দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিচ্ছিন্নতাবাদী, ভারতের দালাল এবং আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগকে বিচ্ছিন্নবাদের আসল শক্তি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতে থাকে। তারা মনে করেছিল, পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার্থে পূর্ব বাংলার জনগণ তাদের এমন অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হবে। পূর্ব বাংলার জনগণ যদি ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের কথায় ছয় দফার পক্ষাবলম্বন করে, তাহলে পূর্ব বাংলা ভারতের একটি অঙ্গরাজ্যে পরিণত হবে। পাকিস্তানি শাসকদের এমন অপপ্রচারে হিতে বিপরীত হয়।

দেশবাসীর উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলেন, ‘আমি পূর্ব পাকিস্তানবাসীর বাঁচার দাবিরূপে ৬ দফা কর্মসূচি দেশবাসী ও ক্ষমতাসীন দলের বিবেচনার জন্য পেশ করিয়াছি। শান্তভাবে উহার সমালোচনা করার পরিবর্তে কায়েমি স্বার্থীদের দালালরা আমার বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো শুরু করিয়াছেন। জনগণের দুশমনদের এই চেহারা ও গালাগালির সহিত দেশবাসী সুপরিচিত। অতীতে পূর্ব পাকিস্তানবাসীর নিতান্ত সহজ ও ন্যায্য দাবি যখনই উঠিয়াছে, তখনই এই দালালেরা এমনিভাবে হৈচৈ করিয়া উঠিয়াছেন। আমাদের মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি, পূর্ব-পাক জনগণের মুক্তির সনদ একুশ দফা দাবি, যুক্ত নির্বাচন প্রথার দাবি, ছাত্র তরুণদের সহজ ও স্বল্প-ব্যয় শিক্ষালাভের দাবি, বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম করার দাবি ইত্যাদি সকল প্রকার দাবির মধ্যেই এই শোষকের দল ও তাহাদের দালালরা ইসলাম ও পাকিস্তান ধ্বংসের ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করিয়াছেন। আমার প্রস্তাবিত ছয় দফা দাবিতে যে পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে পাঁচ কোটি শোষিত-বঞ্চিত আদম সন্তানের অন্তরের কথাই প্রতিধ্বনিত হইয়াছে, তাতে আমার কোনো সন্দেহ নাই। 

হয়রানি ও গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ১৩ মে দিনটিকে সারা দেশে পালন করা হয়েছিল প্রতিবাদ দিবস হিসেবে। সরকারের অত্যাচার-নির্যাতনের বিরুদ্ধে ১৯৬৬ সালের ৭ জুন ছয় দফার রূপকার শেখ মুজিবুর রহমানসহ রাজবন্দিদের মুক্তি এবং ছয় দফাভিত্তিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে হরতালের ডাক দেয় আওয়ামী লীগ। সরকারের শত প্রকার নির্যাতনমূলক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও নির্দিষ্ট দিনে অর্থাৎ ৭ জুন সারা প্রদেশে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। ওই দিন কলকারখানা, গাড়ির চাকা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পূর্ব বাংলার নাগরিকজীবন সম্পূর্ণভাবে স্তব্ধ হয়ে পড়ে। হরতালের সময় পুলিশের গুলিতে তেজগাঁওয়ের শ্রমিক নেতা মনু মিয়া এবং নারায়ণগঞ্জের শামসুল হক, বাবুল, কালীপদ ঘোষ ও রিকশাচালকসহ শ্রমিক-জনতার রক্তে প্লাবিত হয় বাংলার মাটি। রক্তস্নাত ৭ জুনে সর্বমোট নিহত হন ১১ ব্যক্তি। পুলিশ ওই দিন প্রায় ৮০০ আন্দোলনকারীকে গ্রেপ্তার করে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে দায়ের করে অসংখ্য মামলা। ১৫ জুন ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে গ্রেপ্তার করে এবং সেই সঙ্গে নিষিদ্ধ করা হয় ইত্তেফাক পত্রিকা। ৭ জুন জারি করা হয়েছিল ১৪৪ ধারা। কঠোর প্রেস সেন্সরশিপের কারণে ৮ জুনের পত্রিকায় কোনো খবরই ছাপা হয়নি। পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থ ও প্রগতিবাদী আন্দোলনকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান আসামি করে আরো ৩৪ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এনে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা করা হয়।

ছয় দফা কর্মসূচি সমগ্র বাঙালির চেতনার মূলে অগ্নস্ফুিলিঙ্গ ঘটায়। বঙ্গবন্ধু প্রায় বলতেন, ‘ছয় দফার সাঁকো দিলাম স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতায় উন্নীত হওয়ার জন্য। ’ এই দাবির পক্ষে বাঙালি জাতির সর্বাত্মক রায় ঘোষিত হয় ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে। ১৯৭১ সালে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পৃথিবীর মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের।

লেখক : অধ্যাপক ও সভাপতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি।

Place your advertisement here
Place your advertisement here